জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পেলেও নানা সংকটে মণিপুরি তাঁত শিল্প

জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও মণিপুরি তাঁত শিল্প নানা সংকটে জর্জরিত। প্রান্তিক তাঁতিদের মূলধন সংকট, বাজার ব্যবস্থার জটিলতা ও মণিপুরি ‘মইরাং’ নকশায় মেশিনে উৎপাদিত নকল পণ্যের ছড়াছড়িতে সংকটে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী এ শিল্প।

জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও মণিপুরি তাঁত শিল্প নানা সংকটে জর্জরিত। প্রান্তিক তাঁতিদের মূলধন সংকট, বাজার ব্যবস্থার জটিলতা ও মণিপুরি ‘মইরাং’ নকশায় মেশিনে উৎপাদিত নকল পণ্যের ছড়াছড়িতে সংকটে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী এ শিল্প। কয়েক দফা হাতবদল হওয়ায় অধিক দামে ভোক্তারা পণ্য কিনলেও উৎপাদিত পণ্যের প্রকৃত মূল্য না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁতিদের। তবে তাঁত বোর্ডের স্থানীয় বেসিক সেন্টারের দাবি, তাঁতিদের মূলধন সরবরাহ, বাজার ব্যবস্থাপনা, পণ্যের আধুনিকায়নসহ সব সমস্যা চিহ্নিত করে একটি সম্ভাবনাময় পণ্য হিসেবে মণিপুরি তাঁত শিল্পকে এগিয়ে নিতে কাজ করছে তারা।

খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, নকলের ভিড়ে বাজারে মার খাচ্ছে জিআই স্বীকৃতি পাওয়া মনিপুরী তাঁতপণ্য। মণিপুরি তাঁতের শাড়ি নামে বাজারে বিক্রি হচ্ছে মেশিনে তৈরি নকল পণ্য। উৎপাদন খরচ কম হওয়ায় সেই শাড়ি বাজারে কম দামে বিক্রি হচ্ছে। এজন্য মণিপুরি আসল তাঁত শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, শিল্পের সুনাম ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি ক্রেতারা প্রতারিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়ার দাবিতে জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপিসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছেন তাঁতি ও ব্যবসায়ীরা।

চলতি বছরের মে মাসে সিলেটের মণিপুরি শাড়িকে বাংলাদেশের ৫৬তম জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। তাঁতশিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, যাদের হাতের ছোঁয়ায় তৈরি হয় বাহারি শাড়ি, তাদের জীবন ঘুরপাক খাচ্ছে সেই একই বৃত্তে। অধিকাংশ তাঁতির রয়েছে মূলধন সংকট। তাঁতের শাড়িকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বড় মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণী, যারা প্রান্তিক তাঁতিদের সুতা কেনার জন্য অগ্রিম টাকা দেয়, আবার কেউ কেউ তাঁতকল ও কাঁচামাল সরবরাহ করে পণ্য উৎপাদনের আগেই কিনে নেয়। যার কারণে মুনাফার পুরোটাই চলে যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগী ফড়িয়াদের পকেটে। এতে পণ্যের প্রকৃত দাম থেকে বঞ্চিত হন প্রান্তিক তাঁতিরা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশে বসবাসকারী প্রায় দুই লাখ মণিপুরি সম্প্রদায়ের দুই-তৃতীয়াংশ মৌলভীবাজার জেলায় বাস করেন। জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার অর্ধশতাধিক গ্রাম মণিপুরি জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত। নিজেদের ব্যবহারের জন্য একসময় প্রায় প্রতিটি মণিপুরি পরিবারে তাঁতে বোনা পোশাক তৈরি হতো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এখন সে চিত্র বদলালেও ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির উপাদান হিসেবে অনেকে ধরে রেখেছেন এ শিল্প। বিশেষ করে প্রান্তিক পরিবারগুলো যুক্ত রয়েছে তাঁত শিল্পে। পরিবারের বাড়তি উপার্জনের জন্য নারীরা তাঁতের কাজ করেন। দিন দিন পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন ও বিপণনে যুক্ত হয়েছেন নতুন নতুন উদ্যোক্তা। শুধু কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর, রাণীবাজার, মাধবপুর এলাকার অন্তত ২০টি গ্রামে প্রায় দুই হাজার মানুষ তাঁত শিল্পের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। অনেকে বাণিজ্যিকভাবে পোশাক উৎপাদন ও বিপণনের জন্য গড়ে তুলেছেন ছোট কারখানা। মণিপুরি তাঁতের সঙ্গে কমলগঞ্জের অনেক বাঙালি নারীও এখন যুক্ত হয়েছেন। তবে নতুন উদ্যোক্তারা সরাসরি উৎপাদনের চেয়ে বিপণনে বেশি সম্পৃক্ত। কারণ পোশাকের মান, নকশা, রঙ ঠিক রাখতে দরকার দক্ষ কারিগরের। উদ্যোক্তাদের প্রায় সবাই তাঁতিদের তাঁতকল ও কাঁচামাল সরবরাহ করে উৎপাদনে ভূমিকা রাখলেও মুনাফার বড় অংশ চলে যায় তাদের পকেটে। বাজারে পণ্যের দাম বেশি হলেও তাঁতিরা উপযুক্ত দাম পান না।

তাঁতিরা জানান, মণিপুরি তাঁতশিল্পীরা শাড়ি, থ্রিপিস, চাদর, গামছা, পাঞ্জাবিসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন করেন। তবে শাড়ির বাজার সবচেয়ে বড়। বিশেষ করে মণিপুরি তাঁতের শাড়ির বাড়তি কদর আছে রুচিশীল নারীদের কাছে। বাজারে মণিপুরি পণ্যের চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্যহীনতার সুযোগ নিচ্ছেন নকল পণ্য উৎপাদনকারীরা। আধুনিক মেশিনে তৈরি নকল পণ্যে বাজার সয়লাব। এসব পোশাকের ডিজাইন মণিপুরি ‘মইরাং’ ধরনের হলেও তা আদতে মণিপুরি না। মণিপুরি তাঁতে বোনা বা হ্যান্ড মেড একটা শাড়ি উৎপাদন খরচ বাদে ২ হাজার টাকার বেশি দামে পাইকারি বিক্রি করতে হয়। কিন্তু নকল পণ্য ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এতে আসল পণ্য মার খাচ্ছে। ক্রেতারাও প্রতারিত হচ্ছেন।

কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর ইউনিয়নের ভানুবিল মাঝেরগাঁও গ্রামের রাধাবতী দেবী এরই মধ্যে কলাগাছের তন্তু থেকে কলাবতী শাড়ি তৈরি করে দেশব্যাপী পরিচিতি পেয়েছেন। তিনি জানান, ১৯৯২ সাল থেকে তিনি মণিপুরি শাড়ি তৈরি করছেন। ভালো মানের একটি শাড়ি তৈরি করতে দুজন তাঁতির এক সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। অনেকে পুঁজি বিনিয়োগ করতে না পারায় বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন করতে পারছেন না। নিজেদের ব্যবহারের প্রয়োজনীয় পোশাক তৈরির পর অবশিষ্ট পোশাক তারা বিক্রি করেন। যার কারণে বাজারে চাহিদা থাকলেও জোগান বাড়ানো যাচ্ছে না। উৎপাদন খরচ কমাতে অনেকে সুতি সুতার বদলে কোরিয়ান সুতা ব্যবহার করেন। এতে পোশাকের গুণগত মান কমে যাচ্ছে।

একই এলাকার তাঁতি অরুণা দেবী জানান, মণিপুরি তাঁতে বোনা সাধারণ মানের একটি শাড়ি বুনতে দুজন নারীর কমপক্ষে পাঁচদিন সময় লাগে। সব মিলিয়ে একটা শাড়ির উৎপাদন খরচ পড়ে ২ হাজার টাকার মতো। অন্যদিকে পলিয়েস্টার সুতা মিশিয়ে নকশা জাল করে মেশিনে উৎপাদিত শাড়ির উৎপাদন খরচ অর্ধেকেরও কম। সেই নকল পণ্য আসল তাঁতিদের কিছুটা সংকটে ফেলেছে।

আরেক তাঁতি গীতা দেবী জানান, প্রান্তিক তাঁতিরা সরাসরি বাজারজাত প্রক্রিয়ার সঙ্গে এখনো পরিচিত নন। মূলধন সংকটের কারণে তারা ফড়িয়া ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সরাসরি কাঁচামাল নিয়ে পোশাক তৈরি করেন। এ কারণে তাদের কাছে পণ্য অগ্রিম বিক্রি করতে হয়। মুনাফার পুরোটাই চলে যায় মধ্যস্বত্বভোগীর পকেটে।

বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড মাধবপুর বেসিক সেন্টার সূত্র জানায়, স্থানীয় তাঁত শিল্পের উন্নয়নে ১৯৯৭ সাল থেকে এ বেসিক সেন্টার কাজ করে যাচ্ছে। জেলায় প্রায় তিন হাজার তাঁতি রয়েছেন তাদের সমিতিতে। শুধু কমলগঞ্জে রয়েছেন প্রায় দেড় হাজার তাঁতি। এ সেন্টারের মাধ্যমে এখানকার তাঁতিদের স্বল্প সার্ভিস চার্জে ক্ষুদ্র ঋণ ও প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। পাশাপশি আর্থসামাজিক প্রকল্প নামে আরেকটি প্রকল্প পাঁচ ভাগ সার্ভিস চার্জে ঋণ দিচ্ছে। প্রতিটি বড় তাঁতের জন্য ৪০ হাজার টাকা আর কোমর তাঁতের জন্য ৩০ হাজার টাকা ঋণ দেয়া হয়। সর্বোচ্চ একজন তাঁতি পাঁচটা তাঁতের জন্য ২ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ পেয়ে থাকেন। তিন বছরে ঋণ পরিশোধ করতে হয়। ক্ষুদ্র ঋণ চালু হয় ১৯৯৯ সালে এবং আর্থসামাজিক প্রকল্প ঋণ ২০১৮ সাল থেকে চালু হয়। এখন পর্যন্ত প্রকল্প ঋণ দেয়া হয়েছে ৭৭ লাখ টাকা, আরো ৪০ লাখ টাকা ঋণ প্রদানের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। আর ক্ষুদ্র ঋণ দেয়া হয়েছে ১ কোটি টাকার মতো। এর মধ্যে ৭০ ভাগ আদায় হয়েছে। প্রকল্প ঋণ আদায়ের হার ৯৫ ভাগ এবং ক্ষুদ্র ঋণ আদায়ের হার ৬৮ ভাগ।

এছাড়া ‘ফ্যাশন ডিজাইন ট্রেনিং ইনস্টিটিউট’-এ তাঁতিদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। প্রশিক্ষণার্থী তাঁতিরা প্রতিদিন ২৪০ টাকা করে ভাতা পান। এখানে মণিপুরি তাঁতের প্রশিক্ষণই বেশি দেয়া হয়।

তাঁতিদের দাবি, তাঁত বোর্ডসহ যেসব মাধ্যমে তাঁতিদের লোন দেয়া হয় সেটা প্রান্তিক তাঁতিরা খুব কম পান। তাঁতি নন, এমন অনেকে প্রতারণার মাধ্যমে সরকারি সুযোগ-সুবিধা নিয়ে থাকেন। আবার তাঁতিদের কাছ থেকে যেসব ব্যবসায়ী পণ্য কেনেন তারাও তাঁতের ব্যবসার নামে বিভিন্ন সুবিধা নিচ্ছেন। এতে প্রকৃত প্রান্তিক তাঁতিরা বঞ্চিত হচ্ছেন।

বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের কমলগঞ্জ বেসিক সেন্টারের লিয়াজোঁ অফিসার নিতাই চন্দ্র মোদক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মণিপুরি তাঁত একটি সম্ভাবনাময় খাত। শিল্পের উন্নয়ন ও আধুনিকায়নে তাঁত বোর্ডের বেসিক সেন্টার তাঁতিদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ প্রদান করছে। তাঁত বোর্ড এখানকার তাঁতিদের সব রকমের সহায়তা দিচ্ছে। কেনো প্রান্তিক তাঁতি যদি ঋণ না পেয়ে থাকেন আমরা সেটার ব্যবস্থা করব।’

আরও